রাসিক মেয়র পদে আলোচনায় ছয় নেতা, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের
রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী কে হচ্ছেন, তা নিয়ে নগর রাজনীতিতে আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু না হলেও মেয়র পদকে ঘিরে মহানগর বিএনপির ছয় নেতা নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। দলীয় সভা-সমাবেশ, সামাজিক কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক তৎপরতা ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন তারা।
আলোচনায় থাকা ছয় নেতা হলেন—রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশীদ, সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন, সাবেক রাসিক মেয়র ও বর্তমানে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি ও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট, মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি ওয়ালিউল হক রানা এবং মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম রবি।
রাসিক নির্বাচন ঘিরে ছয় নেতার তৎপরতা থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তের প্রশ্নে তাদের অবস্থান অভিন্ন। তাদের বক্তব্য, বিএনপি যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করবে। মনোনয়ন পাওয়ার পর দলীয় প্রার্থীর পক্ষেই সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। ব্যক্তির চেয়ে দলের সিদ্ধান্তই বড়—এমন বার্তাই দিচ্ছেন তারা।
মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশীদ দীর্ঘদিন ধরে নগর রাজনীতিতে সক্রিয়। দলীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সামাজিক কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ, সভা-সমাবেশ ও জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে তার নিয়মিত উপস্থিতি রয়েছে। মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফলে রাসিক নির্বাচন সামনে রেখে তার রাজনৈতিক তৎপরতা নেতাকর্মীদের মধ্যে গুরুত্ব পাচ্ছে।
মামুন অর রশীদের পাশাপাশি মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনও নগরীতে সক্রিয় রয়েছেন। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ রাসিক প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরীর পরিচ্ছন্নতা, নাগরিক সেবা, উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন তিনি। একই সঙ্গে দলীয় কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় রয়েছেন। নগরীর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরেজমিনে কাজ করার কারণে তার তৎপরতাও আলোচনায় রয়েছে।
সাবেক রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখে মাঠে রয়েছেন। ২০১৩ সালে তিনি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালনের পর আদালতের রায়ের মাধ্যমে পুনরায় দায়িত্বে ফেরেন। বর্তমানে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সাবেক মেয়র হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং রাজশাহীর রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অবস্থানের কারণে রাসিক নির্বাচন ঘিরে তার নামও গুরুত্ব পাচ্ছে।
মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সুইটও নগর রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন। সাবেক মহানগর ছাত্রদল ও যুবদল সভাপতি হিসেবে ছাত্র ও যুব রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৬ সালের ১৫ জুন দায়িত্ব গ্রহণের পর নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনাবিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। একই সঙ্গে দলীয় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তার উপস্থিতি রয়েছে।
মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি ওয়ালিউল হক রানাও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। ছাত্রজীবনে রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা দীর্ঘদিন ছাত্র ও যুব রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার সমর্থকদের তৎপরতা রয়েছে।
অন্যদিকে মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম রবিও দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ, বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ এবং দলীয় কর্মসূচিতে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। যুব ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতেও নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন তিনি।
ছয় নেতার রাজনৈতিক পরিচয় ও দায়িত্ব আলাদা হলেও রাসিক নির্বাচন নিয়ে তাদের বক্তব্যে রয়েছে একই সুর। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ব্যক্তিগত আগ্রহ থাকলেও শেষ সিদ্ধান্ত বিএনপির নেতৃত্বই নেবে—এমন অবস্থানে রয়েছেন সবাই। তাদের মতে, দল যাকে সবচেয়ে যোগ্য মনে করবে, তাকেই প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এরপর দলের সব নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে।
এরই দৃশ্যমান প্রকাশ দেখা গেছে গত ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজশাহী মহানগর বিএনপির আয়োজিত র্যালি ও সমাবেশে ছয় নেতাকেই সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা যায়। নগরীর বাটার মোড়ে অনুষ্ঠিত সমাবেশে নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতির মধ্যে মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতারাও ছিলেন একসঙ্গে।
সমাবেশে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু নেতাদের হাতে হাত রেখে ঐক্যবদ্ধতার বার্তা দেন। তিনি নেতাদের সঙ্গে হাত মেলানোর পাশাপাশি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হন। বাটার মোড়ের সমাবেশে তাকে স্লোগান দিতেও দেখা যায়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে নেতাদের এমন ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
রাসিক নির্বাচন প্রসঙ্গেও দলীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। তার বক্তব্যে উঠে আসে, বিএনপি বড় রাজনৈতিক দল হওয়ায় একাধিক নেতা নির্বাচনে আগ্রহী হতে পারেন। তবে দলীয়ভাবে সমন্বয় করে একজনকে প্রার্থী করা হবে এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
এদিকে রাসিক নির্বাচন সামনে রেখে নগর বিএনপির তৃণমূলেও ছয় নেতাকে নিয়ে চলছে আলোচনা। কার সাংগঠনিক অবস্থান কেমন, কার সঙ্গে নেতাকর্মীদের যোগাযোগ বেশি, নগরবাসীর কাছে কার গ্রহণযোগ্যতা কতটা এবং নির্বাচনী মাঠে কে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন—এসব বিষয় নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
তবে এই প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত দলীয় ঐক্যে বড় কোনো বিভাজনের চিত্র দেখা যায়নি। বরং ১ সেপ্টেম্বরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে নেতাদের একসঙ্গে উপস্থিতি এবং ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর হাতে হাত রেখে ঐক্যের বার্তা দেওয়ার দৃশ্য সেই অবস্থানকেই সামনে এনেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাসিক নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক সক্ষমতা, তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক, নগরবাসীর গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ছয় নেতাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাঠে সক্রিয় থাকবেন—এমনটাই এখন দৃশ্যমান।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মাহফুজুর রহমান রিটন নগর ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন। আরডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে আবুল কালাম আজাদ সুইট নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনার দায়িত্ব পালন করছেন। সাবেক মেয়র হিসেবে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের রয়েছে অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে মামুন অর রশীদ, ওয়ালিউল হক রানা ও রফিকুল ইসলাম রবি দলীয় ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন। ফলে ছয়জনই নিজ নিজ অবস্থান থেকে রাসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠে রয়েছেন।
এখন মূল অপেক্ষা দলীয় সিদ্ধান্তের। বিএনপির নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত কাকে রাসিক মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেয়, তা নিয়েই নগরজুড়ে কৌতূহল। তবে প্রার্থী যিনিই হোন, তাকে মেনে নিয়ে সবাই একসঙ্গে কাজ করার বার্তাই দিচ্ছেন আলোচনায় থাকা ছয় নেতা।
ছয়জনেরই লক্ষ্য মেয়র পদ, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের—আর দল যাকে প্রার্থী করবে, তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে থাকার বার্তা দিয়েছে রাজশাহী বিএনপি।
