১৯৫০ সালে সাহেব বাজারে ‘স্টার স্টুডিও’: রাজশাহীতে ছবি তোলার সংস্কৃতির ঐতিহাসিক সূচনা
১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহী শহরের পুরাতন নাটোর রোড, সাহেব বাজার এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ‘স্টার স্টুডিও’। সে সময় ছবি তোলা ছিল আজকের মতো সহজ ও স্বাভাবিক বিষয় নয়। সামাজিক নানা সংকোচ ও রক্ষণশীলতার কারণে রাজশাহীর মানুষের বড় একটি অংশ ছবি তোলার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিল।
এই প্রতিকূল সময়ে মোতাহার হোসেনের উদ্যোগে ‘স্টার স্টুডিও’ প্রতিষ্ঠা রাজশাহীর ফটোগ্রাফি জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। শহরের প্রাণকেন্দ্র সাহেব বাজারে স্টুডিওটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ছবি তোলার সুযোগ আরও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
স্টুডিও প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে কিছু মানুষ প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুলতে সেখানে যেতেন। তবে তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় বিশেষ করে মুসলমানদের একটি অংশ লোকলজ্জা ও সামাজিক সংকোচের কারণে প্রকাশ্যে স্টুডিওতে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। ফলে শুরুতে ‘স্টার স্টুডিও’কে নানা সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়।
মানুষের মধ্যে ছবি তোলার বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে স্টুডিওটির পক্ষ থেকে রাজশাহীর বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের ছবি তুলে বিনা মূল্যে উপহার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছবি তোলার আগ্রহ বাড়তে থাকে।
একসময় ছবি তোলা শুধু প্রয়োজনীয় নথির জন্য নয়, ব্যক্তিগত পরিচয়, পারিবারিক স্মৃতি ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ধরে রাখার একটি মাধ্যম হিসেবেও জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের সময় ‘স্টার স্টুডিও’ রাজশাহীর মানুষের কাছে একটি পরিচিত ফটোগ্রাফির ঠিকানা হিসেবে জায়গা করে নেয়।
পুরাতন নাটোর রোড ও সাহেব বাজারের সেই ‘স্টার স্টুডিও’ শুধু একটি ছবি তোলার প্রতিষ্ঠান ছিল না; রাজশাহীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও একটি নীরব সাক্ষী ছিল। মানুষের মধ্যে ফটোগ্রাফি নিয়ে যে সামাজিক সংকোচ ছিল, তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতেও এমন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে ছবি তোলার জগতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। ক্যামেরা থেকে মোবাইল ফোন—ছবি এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবে সেই পরিবর্তনের বহু আগে, ১৯৫০ সালে রাজশাহী শহরের সাহেব বাজারে প্রতিষ্ঠিত ‘স্টার স্টুডিও’ এ অঞ্চলে ফটোগ্রাফি চর্চা ও ছবি সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
